কুমিল্লা থেকে চট্টগ্রাম: বন্ধুত্বপূর্ণ ট্রেন ভ্রমণের গল্প
কুমিল্লা থেকে চট্টগ্রাম: বন্ধুত্বপূর্ণ ট্রেন ভ্রমণের গল্প
সকালটা ভীষণ ব্যস্ত হলেও আশ্চর্যভাবে উদ্দীপনায় পরিপূর্ণ ছিল। আমি আর ফাইয়াজ—দুই বন্ধু, যারা একে অপরের সঙ্গে ছোটবেলা থেকে ঘনিষ্ঠ,—নির্ধারণ করেছি যে আমরা চট্টগ্রামে যাব। কুমিল্লার এই শান্ত শহর থেকে বড় শহরের অভিজ্ঞতা গ্রহণ করতে আমরা আগ্রহী ছিলাম। ভ্রমণের দিনটি এমন এক দিন, যখন সকালটা সূর্যের হালকা রোদ দিয়ে শুরু হয়েছে।
স্টেশনের দিকে চলতে চলতে আমরা আলোচনার মাঝে আনন্দ ভাগ করে নিচ্ছিলাম। ট্রেন আসার সময় নির্ধারিত ছিল সকাল ৮টা, কিন্তু আমাদের পৌঁছানোর পর দেখা গেল, ট্রেন দেরি করছে। প্রথমে একটু বিরক্তি অনুভব করলেও ধীরে ধীরে আমরা বুঝতে পারলাম, দেরি আমাদের জন্য এক অপ্রত্যাশিত আনন্দের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আমরা স্টেশনের চায়ের দোকানে গিয়ে চা খেতে খেতে একে অপরের সঙ্গে ছোট ছোট গল্প বলছিলাম—স্কুলের স্মৃতি, কলেজের মজার ঘটনা, এবং শৈশবের নানা মজার মুহূর্ত।
দূরে দূরে ট্রেনের হুইসেলের শব্দ আসতে শুরু করলো। ধীরে ধীরে ট্রেন স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ঢুকছে। ট্রেনের ধাক্কা, লোকজনের চিৎকার, যাত্রীদের আসা-যাওয়া—সব মিলিয়ে যেন ভ্রমণের উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিল। আমরা লাফ দিয়ে ট্রেনে উঠলাম। জানালার পাশের সিটটি পেয়ে ধীরে ধীরে বসলাম। ট্রেন চলতে শুরু করল। জানালা দিয়ে হাওয়া মুখে লাগছে, আর চোখে পড়ছে শহরের ধীরে ধীরে দূরে সরে যাওয়া চিত্র। সবুজ ক্ষেত, ছোট ছোট নদী, গ্রামীণ ঘরবাড়ি—সবকিছু যেন এক চমৎকার চিত্রশালা।
ট্রেনের ভিতর আমরা গল্প করতে করতে, একে অপরের সঙ্গে হাসতে হাসতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার করলাম। ফাইয়াজ কখনও হাস্যরস, কখনও জীবনের অভিজ্ঞতা শেয়ার করছিল। আমরা এমন একটি অভিজ্ঞতা উপভোগ করছিলাম যা শুধুই বন্ধুত্ব এবং ভ্রমণের আনন্দের সংমিশ্রণ। প্রতিটি স্টেশনে ট্রেন থামছিল, নতুন যাত্রীরা উঠছিল, কিছু নামছিল—সবকিছু যেন ভ্রমণকে আরও জীবন্ত করে তুলছিল।
ট্রেনের দেরি আমাদের উদ্বেগকে আনন্দে পরিণত করেছিল। জানালার বাইরে নদীর ধারে গাছ, হালকা মেঘ, ছোট ছোট পাখি—সবই যেন আমাদের চোখে এক নতুন চিত্র উপস্থাপন করছে। আমরা দুজন একে অপরকে চ্যালেঞ্জ দিচ্ছিলাম—কে আগে গ্রামগুলোর ছবি মনে রাখবে। এমন ছোট ছোট খেলা আমাদের মনকে হালকা করে তুলছিল।
প্রায় তিন ঘণ্টা ট্রেনের মধ্যে কাটিয়ে অবশেষে চট্টগ্রামে পৌঁছালাম। এখানে আলাদা হওয়ার সময় এসে গেছে। ফাইয়াজ তার বাড়িতে চলে গেল, আর আমি আমার বন্ধু বাসায় উঠলাম। যদিও আমরা আলাদা পথে যাচ্ছিলাম, কিন্তু অভিজ্ঞতার উত্তেজনা এখনও কমেনি।
চট্টগ্রাম একটি ব্যস্ত, কিন্তু রঙিন শহর। আমি রাস্তায় বেরিয়ে পড়লাম। শহরের ব্যস্ততা, মানুষের ভিড়, দোকানপাট—সবকিছু চোখে পড়ছিল। রাস্তার ধারে বিভিন্ন ধরনের খাবারের স্টল, ছোট ছোট দোকান, শহরের মানুষ—সব মিলিয়ে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। এখানে নতুন মানুষের সঙ্গে মেলামেশা, নতুন খাবার চেখে দেখা, এবং শহরের সংস্কৃতি দেখার অভিজ্ঞতা—সবকিছু ভ্রমণকে আরও অর্থবহ করে তুলছে।
দিনের বাকি সময়ে আমি শহরের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ালাম। শহরের রঙিন আলো, বাজারের গরম ভাপ, মানুষের কথাবার্তা—সবকিছু মনে করিয়ে দিচ্ছিল কেন ভ্রমণ করা গুরুত্বপূর্ণ। শহরের প্রতিটি স্থানে আলাদা গল্প, আলাদা রঙ, আলাদা মানুষ—সবই যেন স্মৃতির ভান্ডারে সংরক্ষিত হয়ে যায়।
ফাইয়াজ তার বাড়িতে চলে গেল। তার বাড়ি শহরের কিছুটা শান্ত এলাকা—বড় রাস্তা থেকে কিছুটা দূরে। আমি তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলাম, এবং সে আমাকে তার বাড়ির পরিবেশ দেখাচ্ছিল ফোনের মাধ্যমে। তার পরিবার আমাকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাল। ফাইয়াজের ছোট ছোট ভাইবোনের কৌতূহল, বাবা-মায়ের অতিথিপরায়ণতা—সব মিলিয়ে আমার ভ্রমণের আনন্দ আরও বেড়ে গেল। ফাইয়াজ তার বাড়ির আশেপাশের কিছু স্থান দেখাল—ছোট উদ্যান, গ্রামের মতো শান্ত পরিবেশ, আর শহরের দূরের শব্দ কেবল হালকা।
আমি তখন আমার "২নং গেইট নাসিরাবাদ" বন্ধুর বাসায় উঠলাম। বন্ধু বাসা শহরের ব্যস্ত এলাকায়, যেখানে রাস্তায় মানুষ, দোকান, ট্রাফিক—সব মিলিয়ে এক জীবন্ত চিত্র। বন্ধু বাসায় এসে প্রথমে বিশ্রাম নিলাম, তারপর শহরের বিভিন্ন স্থান ঘুরতে বের হলাম। চট্টগ্রামের রঙিন জীবন দেখার সুযোগ মিলল—বাজার, রাস্তার দোকান, ছোট ছোট খাবারের স্টল, হ্যান্ডিক্রাফটের দোকান। রাস্তার ধারে মানুষজনের হুলস্থূল, হট্টগোল—সব কিছু যেন এক চমৎকার ভ্রমণ চিত্র।
দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য একটি ছোট রেস্তোরাঁয় ঢুকলাম। এখানে স্থানীয় খাবারের স্বাদ একেবারে অনন্য। ভর্তা, মাছ, এবং স্থানীয় মিষ্টি—সবকিছু চেখে দেখলাম। ফাইয়াজের সঙ্গে বারবার ফোনে গল্প হচ্ছিল। সে তার বাড়ির খাবার এবং পরিবারের অভিজ্ঞতা শেয়ার করছিল। আমরা দুজন একে অপরের অভিজ্ঞতা তুলনা করছিলাম।
এরপর শহরে দিকে হেঁটে চললাম। চকোলেট, বিভিন্ন ধরণের স্থানীয় খাবার, রঙিন কাপড়, হ্যান্ডিক্রাফট—সবই চোখে পড়ছিল। ছোট ছোট দোকানদাররা তাদের পণ্য বিক্রির চেষ্টা করছিল। আমি কিছু স্মৃতিচিহ্ন কিনলাম—বন্ধুদের জন্য ছোট উপহার, আর নিজের জন্য একটি ছোট নোটবুক। শহরের রাস্তা-ঘাটে হেঁটে হেঁটে বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে আলাপ হলো। তাদের ভিন্ন ভিন্ন জীবনধারা এবং রূপের সঙ্গে পরিচয় আমার অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করল।
দিনের শেষে আমি ফাইয়াজের সঙ্গে আবার সংযোগ করলাম। সে আমাকে বলল যে তার পরিবারের সঙ্গে সন্ধ্যা কাটানো এবং গল্প করা খুব আনন্দদায়ক ছিল। আমরা দুজন মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম, শহরের সন্ধ্যায় আবার দেখা হবে। এভাবে শহরের বিভিন্ন স্থান, মানুষের সঙ্গে মেলামেশা, খাবারের স্বাদ, আর বন্ধুদের সঙ্গে সংযোগ—সব মিলিয়ে দিনের অভিজ্ঞতা এক চমৎকার গল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে।
-লিয়ন ত্রিপুরা
১১ আগষ্ট ২০২৫
Comments
Post a Comment